আজ

  • বুধবার
  • ২৩শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  • ৯ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মুহুরীর জনপদে আকস্মিক বন্যার ক্ষতচিহ্ন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে ভারতীয় উজান থেকে ভেসে আসা ঢলের প্রভাবে বেড়িবাঁধ ভেঙে সৃষ্ট বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে মুহুরী ও কহুয়া নদীর পানি। এদিকে জনপদ থেকে যতই বন্যার পানি কমছে, ততই দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষতচিহ্ন। রাস্তা-ঘাট, ফসলী জমি, মাছের পুকুর থেকে সবখানেই রয়েছে বন্যার প্রভাব।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফেনীর উপ-পরিচালক তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী জানান, দুই উপজেলায় ২৫ শতাংশ আউশ ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এ বন্যায়। প্লাবিত এলাকায় মাছের ঘের, ধানের বীজতলা, রাস্তা-ঘাট, বাড়ি-উঠোনও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হঠাৎ বন্যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফুলগাজী-বক্সমাহমুদ আঞ্চলিক সড়ক।

    উপ-পরিচালক জানান, ফুলগাজীতে ২৯ হেক্টর এবং পরশুরামে ৪৪ হেক্টর জমির বীজতলা এখনো পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। তবে ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য নিরূপণে আরও একদিন সময় লাগবে। এরপর পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

    তিনি জানান, চলতি বছর জেলায় ৩ হাজার ৪৩৪ হেক্টর জমিতে আমনের বীজতলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ফুলগাজীতে ৩২০ হেক্টর এবং পরশুরামে ২৫৬ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছে। এছাড়া সংকট নিরসনে সরকারিভাবে এক একর জমিতে আমন বীজতলা করা হবে। কৃষকের ধানের বীজ সংকট দেখা দিলে সরকারি বীজ হতে ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করা হবে।

    ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। মাছ চাষ হচ্ছে এমন আনুমানিক ১২০টি পুকুর বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। ১০ হেক্টর জমির সবজির আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমনের বীজতলা পানিতে এখনো ডুবে আছে। বাড়ি-ঘরের ক্ষতিসহ সব ধরণের ক্ষতির তালিকা করা হচ্ছে।

    পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াছমিন আকতার জানান, উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নে ২টি ও বক্সমাহমুদ ইউনিয়নে ৯টি গ্রামের ৭শ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও ৭৪টি মৎস্য পুকুর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।

    এর আগে রোববার সন্ধ্যার দিকে টানা বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফেনীর মুহুরী নদীর ৯ স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পরশুরামের চিথলিয়া ইউনিয়নে ৭টিসহ ৯টি এবং ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের ৭টিসহ মোট ১৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়। বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, পুকুর প্লাবিত হয়ে যায়। এছাড়া বন্যার পানিতে ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়কও ডুবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

    এদিকে ফেনীতে টেকসই মুহুরী বাঁধ ও নদী ড্রেজিংসহ বন্যা প্রতিরোধে ৮২৫ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফেনীর বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শনে এসে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে তা একনেকে যাবে। সব ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে শুরু হবে প্রকল্পের কাজ। আগামী দুই বছরে সম্পন্ন হবে প্রকল্পটি।

    পানি উন্নয়ন বোর্ড ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন বলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন প্রকল্প নামে ৮২৫ কোটি টাকার প্রস্তাবিত প্রকল্পের মধ্যে নদী খনন, ব্রিজ নির্মাণ, মুহুরী নদীর বাংলাদেশ (ফেনী) অংশে ৯২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ, বাঁকা অংশ সোজাকরণ, লুপ, বেড়িবাঁধের রাস্তা পাকাকরণসহ সবগুলো কাজের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকা। এ কাজে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের জন্য অবশিষ্ট টাকা বরাদ্দ চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

    নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, প্রস্তাবনাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কারিগরি শাখায় যাচাই-বাছাই চলছে। এরপর মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় হয়ে একনেকে অনুমোদনের জন্য উঠবে।

    সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার জানান, প্রস্তাবনা অনুয়ায়ী ফেনীর ফুলগাজী, পরশুরামে মুহুরী, সিলোনিয়া এবং কহুয়া নদীর গভীরতা বাড়াতে খনন কাজ হবে। এতে জলাধারের আকার বাড়বে, উজানের ঢল যেন সহজভাবে সাগরে যেতে পারে।

    নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন বলেন, মুহুরী নদীর পরশুরাম অংশের ব্রীজগুলো ৮০ থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত হলেও ফুলগাজী এসে ব্রীজগুলো ৪০-৪৫ মিটার হয়ে গেছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ফুলগাজীর বরইয়া ব্রীজ দৈর্ঘ্যে ৪৪ মিটার এবং বাজার সংলগ্ন রেলওয়ে ব্রীজ ৪৫ মিটার। এতে করে নদীর বিস্তৃতি কমে যাওয়ায় উজানের পানির প্রবল চাপে ফুলগাজী অংশে এসে ফুলে উঠে। এতে বাঁধ টিকিয়ে রাখা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পরশুরামের ধনীকুণ্ডা হতে ফুলগাজী উপজেলার জগতপুর পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার নদী নতুন করে খনন করা হবে। ব্রীজগুলো হয়তো নতুন করে গড়তে হবে।

    বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বন্যার পানি নেমে গেলেই দ্রুততর সময়ে যথাযথভাবে সংস্কার করা হবে। তবে প্রকল্পের অনুমোদন পেলে মুহুরী বেড়িবাঁধ নিয়ে সমস্যা থাকবে না।

    ফেনী ট্রিবিউন/এএএম/এপি


    error: Content is protected !! please contact me 01718066090