আজ

  • মঙ্গলবার
  • ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ১১ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ইতিহাস-ঐতিহ্যে পরশুরাম

  • এম. এ হাসান
  • বাংলাদেশের প্রাচীন ও ইতিহাস সমৃদ্ধ উপজেলা পরশুরাম। ৯৫.৭২ বর্গ কি. মি. আয়তনের ছোট্ট পরশুরামের শাসন ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে বারবার।

    ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায়, পরশুরাম প্রায় ৮ হাজার বছর ধরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ১২ শতকের পরে বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ পরশুরাম বিজয় করেন। ১৭৪৮ সালে ভাটির বাঘ খ্যাত শমসের গাজী পরশুরামসহ খন্ডল পরগনা অধিকার করেন। ১৭৬০ সাল পর্যন্ত ১২ বছর পরশুরাম শাসন করার পর আবারো এটি ত্রিপুরার হস্তগত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্তির পর থেকে এটি পূর্ব পাকিস্তান অংশে পড়ে।

    কালের আবর্তনে পরশুরামে অনেক ইতিহাস স্থান করে নিয়েছে। এর মধ্যে পরশুরামের ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলো অন্যতম। তবে দর্শনীয় স্থানগুলো রক্ষণাবেক্ষণে কোন উদ্যোগ নেই। সংক্ষেপে দর্শনীয় স্থানগুলোর বর্ণনা দেয়া হল:

    শমসের গাজীর দীঘি :
    ১৭শ’ শতকের কোন এক সময়ে খন্ডল পরগনার তৎকালীন শাসক বীর শমসের গাজী উপজেলার সাতকুচিয়ায় শমসের গাজীর দীঘিটি খনন করেন। প্রায় ১০ একর আয়তনের এ দীঘি এখন পরশুরামের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

    উজীরের দীঘি :
    মির্জানগর ইউনিয়নের পশ্চিম সাহেব নগর গ্রামে উজীরের দীঘি অবস্থিত। শমসের গাজী তার চাচাত ভাই ও উজীর ছাদু গাজীর নামে এ দীঘিটি খনন করেন বলে জনশ্রুতি আছে। এর আয়তন প্রায় ৬ একর।

    ঢালুয়া দীঘি :
    উপজেলার আরেক ক্ষুয়িষ্ণু ঐতিহ্য ঢালুয়া দীঘি। বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের দক্ষিণ গুথুমা গ্রামে বাংলার বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম চাঁন গাজী ঐ দীঘিটি খনন করেন বলে জানা যায়। এর আয়তন প্রায় ১২ একর। এটি মহিষের দীঘি নামেও পরিচিত।

    মধুমালাসহ আরও কয়েকটি দীঘি :
    মির্জানগর ইউনিয়নের বীরচন্দ্র নগর গ্রামে রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য মধুমালার দীঘি খনন করেন। মেলাঘরে খনন করা হয় রাজার মার দীঘি। মির্জানগরে আছে গগনশীল দীঘি। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত পৌরসভার সলিয়া দীঘিও অন্যতম। বর্তমানে এগুলো প্রায়ই ভরাট হয়ে গেছে।

    মুহুরীর চর :
    পরশুরামের আরেকটি দর্শনীয় স্থান মুহুরীর চর। ৯২.৩৩ একর আয়তনের মুহুরীর চরটি ভারত-বাংলাদেশের অমীমাংসিত ভূমি হিসেবে রয়েছে। মুহুরী নদী সংলগ্ন এ চরের বালুকারাশি ও চরের উপরিভাগ দেখতে অনেকেই এখানে আসেন।

    রাবার ড্যাম :
    বেড়াবাড়িয়ায় কহুয়া নদীর উপর নির্মিত রাবার ড্যামটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। ২০০৭ সালে এটি নির্মিত হয়। এর অপরূপ নির্মাণ শৈলী দর্শনার্থীদের হৃদয় কাড়ে।

    বাঘা মামা(র)এর মাজার:
    বিলোনিয়া স্থলবন্দের পূর্ব পাশেই আধ্যাত্বিক ব্যাক্তি বাঘা মামা(র) এর মাজার অবস্থিত।প্রতিবছর বাঘা মামার স্মরণে বিশাল ওরশের আয়োজন করা হয়।

    আব্দুল্লাহ শাহ (র)এর মাজার :
    ইসলাম ধর্মের প্রচারক হযরত শাহাজালাল (র)-এর সাথে ৩১৩ জন আওলিয়া বাংলাদেশে আসেন। এর মধ্যে আধ্যত্মিক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ শাহ (র) অন্যতম। গুথুমায় তার মাযার অবস্থিত। এছাড়া এখানেই শুয়ে আছেন আরেক ইসলাম প্রচারক হযরত জংলী শাহ(র)।
    সত্যনগরের শাহেনশাহ ফকির (রঃ), রাঙ্গামাটিয়া গ্রামে কামাল মামা শাহ(র)এর মাজার ও রাজষপুরে সৈয়দ চাঁদশাহ(র)এর মাজার রয়েছে।

    মুক্তিযুদ্ধে বিলোনিয়া :
    বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাসে বিলোনিয়ার রণাঙ্গণের অনেক কীর্তি রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনীর অফিসারদের প্রশিক্ষণে বিলোনিয়া রণাঙ্গণ এর রণকৌশল পাঠ্যসূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

    বিলোনিয়া স্থলবন্দর :
    ২০০৯ সালের ৪ অক্টোবর ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিলোনিয়া স্থলবন্দর চালু হয়। এটি বাংলাদেশের ১৭তম স্থলবন্দর। বিলোনিয়া স্থলবন্দর উভয় দেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

    রাজষপুর বড়বাড়ি কবরস্থান :
    চিথলিয়া ইউনিয়নে ভারত সীমান্ত সংলগ্ন রাজষপুর এলাকায় প্রায় ১৩ দোন ১৩ কানি জমির উপর অবস্থিত এ কবরস্থানটিতে আশপাশের প্রায় ৮-১০ গ্রামের মানুষকে দাফন করা হয়।

    আশ্রাফপুর-মধুগ্রাম কবরস্থান :
    মির্জানগর ইউনিয়নের আশ্রাফপুর-মধুগ্রাম কবরস্থান ফেনী জেলার বৃহত্তম কবরস্থান। এর আয়তন প্রায় ১৫০ একর। প্রাচীন কবরস্থান হওয়ায় এটি অনেকেই দেখতে আসেন। তবে বন বিভাগ এ কবরস্থান দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে।

    পাঁচ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধি :
    পরশুরামের ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসার পাশে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর হাতে শহীদ রওশন,আজিজসহ ৫ জন মুক্তিযোদ্ধার সমাধি রয়েছে।

    মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ :
    মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া শহীদদের স্মরণে বিলোনিয়া ও সলিয়ায় গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ।সলিয়ার স্মৃতিস্তম্ভটির কাজ শেষ হলেও নানা জটিলতায় উদ্বোধন হচ্ছে না।

    ঐতিহ্যের শীতল পাটি:
    ধীরে ধীরে পাটি তৈরির পেশা বিলুপ্তির পথে। তবু নানা সমস্যার মধ্যেও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে পরশুরাম পৌর এলাকার অনন্তপুর গ্রামের নারীরা। শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এই পাটিগ্রাম।

    দ্বিতল মাটির ঘর:
    ইট-পাথরের দালানের ভিড়ে আজকাল মাটির ঘর তেমন নেই বললেই চলে। শহরেতো নয়ই গ্রামেও কম। তবে পরশুরাম পৌরসভার উত্তর গুথুমা গ্রামের তাকিয়া পাড়ায়।২০০৯ সালে আমেরিকা প্রবাসী আবদুল মোমেন মন্জু গড়ে তোলেন দ্বিতল মাটির ঘর। মূলত ঐতিহ্যকে ধরে রাখতেই এটি নির্মান করেন তিনি।এটি এখন পরশুরামের একটি দর্শনীয় স্থানে পরিচিতি লাভ করেছে।

    এক গ্রাম এক পরিবার :
    এক গ্রামে এক পরিবার রয়েছে উপজেলা জয়চাঁদপুর গ্রামে। জনশ্রুতি আছে, ওলাবিবির আগমনে কলেরা রোগে এ গ্রামের সব মানুষ মারা যায়। বিরান ভূমিতে পরিণত হয় এ গ্রাম। বর্তমানে এ গ্রামে ফেলু মিয়ার পরিবারসহ কয়েকটি পরিবার বসবাস করছে।

    রাবার বাগান:
    ২০১০ মির্জানগরের জয়ন্তীনগর গ্রামে হাজী মো মোস্তফার মালিকানাধীন ২৫ একর জায়গায় ৮ হাজার রাবার গাছের চারা রোপণ করা হয়।গাছ বড় হতেই এটি একটি দৃষ্টিনন্দন স্থানে পরিণত হয়।বর্তমানে রাবার গাছ থেকে রাবার সংগ্রহ করা হচ্ছে।

    একটি সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতির প্রেরণার উৎস ইতিহাস ঐতিহ্য। পরশুরামের এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

    লেখক:
    এম.এ হাসান
    গণমাধ্যমকর্মী
    পরশুরাম,ফেনী।


    error: Content is protected !! please contact me 01718066090