আজ

  • রবিবার
  • ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • ১২ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

আগুনে দুই শিশু হত্যা : সম্পত্তি দখলে নিতে বিরিঞ্চির ঘটনায় আজিমকে বানানো হয় ‘জজমিয়া’

  • বিশেষ প্রতিবেদক
  • ৪শ ৬ শতক ভূমি দখলে নিতে পরিকল্পিত ভাবে ফেনী শহরের বিরিঞ্চি এলাকায় আগুনে দুই শিশু মৃত্যুর মামলায় প্রধান আসামী করা হয় ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর এলাকার প্রবাসী আবদুল আজিমকে। ভূক্তভোগী আবদুল আজিম তার বাবা আবু আহাম্মদ নিখোঁজ সংক্রান্ত একটি সাধারণ ডায়েরির বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে গিয়ে সামনে আসে ফেনী শহরের বিরিঞ্চি এলাকায় আলোচিত ডাবল মার্ডার মামলার ঘটনার পেছনে ছাপা পড়ে থাকা লোমহর্ষক নানা ঘটনা।

    জানা যায়, ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠানগর ইউনিয়নের পশ্চিম মধুগ্রাম এলাকার আলী পাটোয়ারী বাড়ির আবু আহাম্মদ জীবনের দীর্ঘ সময় প্রবাসে কাটিয়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে ৪০৬ শতক ভূমির মালিক হন। দাম্পত্য জীবনে তিনি ছেলে আবদুল আজিম ও কন্যা নিশাত তাছলিমের জনক হন।

    পশ্চিম মধুগ্রামের জনসাধারণের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিগত কিছুদিন আগে তারা আবু আহাম্মদের সকল সম্পত্তি (৪০৬ শতক) তার মেয়ে নিশাতের নামে হেবা দলিল করে দিয়েছে বলে শুনেছেন। কিন্তুু এলাকাবাসী আবু আহাম্মদকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বিষয়টি মিথ্যা বলে দাবি করেন। এ নিয়ে আবু আহাম্মদের ছেলে আজিম ও মেয়ে নিশাতের সাথে বিরোধের সূত্রপাত তৈরী হয়। বাবার সম্পত্তি লিখে নেয়ার বিষয়ে শহরের বিরিঞ্চি এলাকার বাসিন্দা ভগ্নিপতি রাশেদুল ইসলামের সাথেও বিরোধের সৃষ্টি হয় আজিমের।

    আজিম জানায়, আমার বোন নিশাত বাবাকে না জানিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে ২০২২ সালের জুলাই মাসে জাল দলিল করে বাড়িসহ সবগুলো জমি লিখে নেয়। বিষয়টি আমি জানার পর প্রতিবাদ করলে আমার বোন নিশাত ও ভগ্নিপতি রাশেদের সাথে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

    এদিকে ৩ অক্টোবর ফেনী শহরের বিরিঞ্চি এলাকায় আমার ভগ্নিপতির ভাই সাইদুল ইসলাম রনির ঘরে আগুনে পুড়ে তার দুই সন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এ ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচিত হয়ে ওঠে। আমি লোকজনের মুখে আমার ভগ্নিপতির ভাইয়ের দুই সন্তানের মৃত্যুর বিষয়টি শুনেছি। ৭ অক্টোবর হঠাৎ র‌্যাব আমাকে গ্রেফতার করে ফেনীতে নিয়ে আসে। পরে আমি জানতে পারি, আমি নাকি আমার ভগ্নিপতির ভাইয়ের ঘরে আগুন দিয়ে তার দুই সন্তানকে হত্যা করেছি এবং ওই মামলায় আমাকে প্রধান আসামী করে ১৩ জনের নামে মামলা হয়েছে। এ মামলায় নানা ঘটন-অঘটনের পর আমি ৪ মাস হাজতবাসের পর ২৩ জানুয়ারী উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাই। এরপর কিছুদিন আমি মানসিক ও শারিরিক ভাবে অসুস্থ থাকার পর গ্রামে গিয়ে জানতে পারি বাড়িতে আমার মা ও বাবা নেই। তারা কোথায় আছে সেটিও কেউ জানাতে পারছেনা। এক পর্যায়ে আমি ৩১ জানুয়ারী আমার বাবার সন্ধান চেয়ে ছাগলনাইয়া থানায় একটি ডায়েরী করি।

    বাবা নিখোঁজের ঘটনায় সন্তানের ডায়েরীর একটি কপি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে আসলে এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে থাকে একটি টিম। টিম আজিমের বাবা নিখোঁজের বিষয়ের সাথে বিরিঞ্চির ডাবল মার্ডারের ঘটনার কোন সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা তা জানতে আজিমের গ্রামের বাড়ি পশ্চিম মধুগ্রাম ও ফেনী শহরের বিরিঞ্চি এলাকায় তদন্ত শুরু করে। এক পর্যায়ে ওই তদন্তে উঠে আসে নানা ঘটনা।

    তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষনে দেখা যায়, আজিমের ভগ্নিপতি রাশেদুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী নিশাত। পরে ছাগলনাইয়া উপজেলার মোকছেদা আক্তার সুমিকে বিয়ে করেন রাশেদ। এক পর্যায়ে সুমি ৩৮ লক্ষ টাকা প্রতারণা ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় স্বামী রাশেদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হয়। দ্বিতীয় স্ত্রীর মামলার চাপ থেকে রক্ষা পেতে প্রথম স্ত্রী নিশাতকে টাকার জন্য চাপ দিতে থাকে রাশেদ। সংসার রক্ষার্থে নিশাত তার বাবার সকল সম্পত্তি জালদলিল করে লিখে নেয়। বিষয়টি জানাজানির পর ওই সম্পত্তির অবশিষ্ট্য একমাত্র ওয়ারিশ আজিমের সাথে বিরোধের সৃষ্টি হয় নিশাত ও তার স্বামী রাশেদের।

    আজিম-নিশাতের স্বজনদের ভাষ্য, নিশাতের নামে হেবা দলিলটি বাতিল করতে আজিম আদালতসহ বিভিন্ন স্থানে দৌড়ঝাপ শুরু করে। একই সময়ে ফেনীর বিরিঞ্চিতে রাশেদের বাড়িতে তার ভাইয়ের ঘরে অগ্নিকান্ডে দুই শিশুর মৃত্যুর স্পর্শকাতর এ ঘটনায় ফেনী মডেল থানায় ভূক্তভোগী রনি বাদি হয়ে ১৩ জনের নামে মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় রাশেদের সলাপরামর্শে প্রধান আসামী করা হয় রাশেদের সমন্ধি আবদুল আজিমকে। আর ১৩ নাম্বার আসামী করা হয় রাশেদের দ্বিতীয় স্ত্রী সুমিকে। এই মামলায় রাশেদের ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরেই আজিম ও সুমিকে ফাঁসানো হয়। অথচ এই মামলায় কোন ভাবেই রাশেদের সমন্ধি আজিম ও রাশেদের দ্বিতীয় স্ত্রী সুমির কোন সেতুবন্ধনের সুযোগ ছিলো না।

    অনুসন্ধানে জানা যায়, আজিমকে ৭ অক্টোবর ডাবল মার্ডার মামলায় গ্রেফতারের পর তার বাবা আবু আহাম্মদ নিজের জমি স্থানীয় শহীদ উল্লাহর কাছে ১ লাখ টায় বন্ধক দেয়। স্থানীয় পর্যায়ে সৃজিত ওই স্ট্যাম্পে আজিমের মাসহ স্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে স্বাক্ষী করা হয়। কিন্তুু পরে সবাই জানতে পারে, ২০২২ সালেই ওই জায়গা নাকি আবু আহাম্মদ তার মেয়েকে দান করে দিয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়রা আবু আহাম্মদকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে নিশাত ও রাশেদ বৃদ্ধ আবু আহাম্মদকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়।

    অনুসন্ধানে গিয়ে কথা হয় সাবেক ইউপি সদস্য স্থানীয় নুর ইসলামের সাথে। তিনি জানান, ‘গত কিছুদিন ধরে হঠাৎ করে এলাকায় আবু আহম্মদকে দেখা যাচ্ছে না। পরে লোকমুখে জানতে পারি একমাত্র মেয়ে নিশাত তার কাছ থেকে জোরপূর্বক সহায়-সম্পত্তি লিখে নিয়েছেন। ষড়যন্ত্রমূলক একটি মামলায় তার একমাত্র ছেলে কারাগারে গেলে কেবা কারা আবু আহাম্মদকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে। এখন তার কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।’

    আবু আহাম্মদের বিষয়ে জানতে সাংবাদিকরা গ্রামে এসেছে এমন খবর শুনে দৌড়ে আসেন স্থানীয় রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি ২০০৭ সালে আবু আহাম্মদের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা দিয়ে ২৪ ডিসিমেল জায়গা ক্রয় করি। কিন্তুু তার মেয়ে নিশাত সকল সম্পত্তি লিখে নিয়ে জমা খারিজ করানোর সময় আমার জায়গাটিও তাদের নামে করে নেয়। বিষয়টি আমি এসিল্যান্ড অফিসে জানিয়েছি।

    স্থানীয় শহীদুল্লাহ জানান, আবু আহাম্মদ ছেলেকে জামিন করানোর কথা বলে আমার কাছে ১শ ডিসিম জমি বন্ধক দিয়ে ১ লাখ টাকা নিয়েছে। এখন শুনতেছি ওই জমিও নাকি তার মেয়ে নিশাত জাল কবলা করে নিয়ে গেছে।
    আবু আহম্মদের বাড়িতে গিয়ে দেখা হয় তার ছোট ভাই ফয়েজ আহম্মদের সাথে।

    তিনি জানান, আমার ভাই নাকি সব সম্পত্তি তার মেয়ের নামে লিখে দিয়েছে। বিষয়টি জানার পর আমি আমার ভাইয়ের সাথে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, তিনি তার কোন সম্পত্তি ছেলে অথবা মেয়ে কাউকে লিখে দেন নি।

    ভুক্তভোগী আবদুল আজিম জানান, আমার বাবার সম্পত্তি জাল জালিয়াতি করে লিখে নেয়া দলিলটি পাকাপোক্ত করতে আমাকে ডাবাল মার্ডার মামলায় প্রধান আসামী করা হয়েছে। আমার কারাগারে থাকাকালে আমার বাবার সম্পত্তি আমার বোনের নাম থেকে আমার ভগ্নিপতির নামে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। আমার বাবা জালজালিয়াতির বিষয়টি মানুষকে বলে দিতে পারে; তাই তারা আমার বাবাকে অজ্ঞাত স্থানে লুকিয়ে রেখেছে। আমি ধারণা করছি, তারা সম্পত্তি দখলে নিতে আমার বাবাকে এবং আমাকে হত্যা করতে পারে। তাই আমি আমার বৃদ্ধ বাবাকে ফেরৎ চাই। জীবনের নিরাপত্তা চাই। আমার ভগ্নিপতি রাশেদকে বিরিঞ্চির ডাবল মার্ডার মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রকৃত ঘটনা বের হবে বলেও দাবি করেন তিনি।

    ফেনী ট্রিবিউন/এএএম/এটি


    error: Content is protected !! please contact me 01718066090