আজ

  • মঙ্গলবার
  • ৬ই ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মনোবলের লড়াইয়ে করোনা জয় করেছি

  • ড. বদিউল আলম মজুমদার
  • করোনা একটি ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধি। এখনো পর্যন্ত এর কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই। সহজেই যে কোনো মানুষ করোনায় আক্রান্ত হতে পারে। এতে কারও স্পর্শে আসতে হবে না। দূর থেকেও আক্রান্ত হতে পারে। তবে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আমি ও আমার পরিবার সাবধানেই ছিলাম। গত ১৮ মার্চ থেকে আমি ঘর থেকে বের হইনি। আমার পাঁচ সন্তান। এর মধ্যে দুই কন্যা নিয়ে আমরা বাসায় থাকছি। পরিবার নিয়ে আমরা বাসার দোতলায় থাকি। এমনকি নিচতলায়ও যাইনি। অত্যন্ত সাবধানতা সত্ত্বেও আমরা পুরো পরিবার আক্রান্ত হয়েছিলাম। কীভাবে হয়েছি, তা বলতে পারব না। আপনি যতই সাবধান হোন না কেন, আপনিও যে কোনোভাবে আক্রান্ত হতে পারেন। এ জন্য সর্বোচ্চ সাবধানতাও যথেষ্ট নয়।

    মে মাসের শেষ দিকে আমি কিছুটা জ্বর অনুভব করি। ওই সময় আমার স্ত্রী ও দুই কন্যা করোনায় আক্রান্ত হন। গত ৪ জুন টেস্টের মাধ্যমে আমিও নিশ্চিত হলাম, আমি করোনায় আক্রান্ত। যেহেতু আমরা সবাই আক্রান্ত তাই এক সঙ্গেই ছিলাম। আমার দ্বিতীয় ছেলে আমেরিকায় করোনা চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। প্রথম থেকেই আমরা তার পরামর্শে সবকিছুই করি। সে কিছু কিছু চিকিৎসা পরামর্শ দিত। এরপরও আমরা খুবই সাবধানতা অবলম্বন করি। আমাদের বাড়িতে কেউ আসত না, আমরাও কোথাও যেতাম না। তবে বাইরে থেকে বাজার একজন দিয়ে যেত। ওই বাজারের জিনিসপত্রে কোনো সমস্যা ছিল কি না, বলতে পারব না। আবার যে বাজার নিয়ে আসত সে যদি করোনায় আক্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলেও ওই বাজারের সঙ্গে করোনা হতে পারে। আমি আমার ছেলের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করেছি এবং পরিবারের সবাইও তাই করেছে। একটা বড় সমস্যা হলো রক্ত জমাট বাঁধা। এ জন্য আমরা ইনজেকশন নিয়েছি। আরও কিছু কিছু ওষুধ সেবন করেছি। সবচেয়ে বড় কথা, যেহেতু এই রোগের কোনো স্বীকৃত চিকিৎসা নেই, আপনি যদি হাল ছেড়ে দেন বা হা-হুতাশ করেন, তাহলে আপনার জন্য এটা কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমি প্রথম থেকেই মনে করেছি যে, এখানে মনোবল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমি সব সময় ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করার চেষ্টা করেছি। দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও নিজেকে কাজের মধ্যে মগ্ন রাখার চেষ্টা করেছি। আমার জীবনে অনেক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি বা ঝুঁকি এসেছিল। মৃত্যুর কাছাকাছি এসেও আমি বেঁচে গেছি। মৃত্যুর শীতল স্পর্শ আমার গায়ে লেগেছে। তা সত্ত্বেও আমি বেঁচে গেছি। আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শৈশবে আমি যখন মায়ের কোলে ছিলাম, তখন আমার একবার কলেরা হয়েছিল। সবাই ধরেই নিয়েছিল, আমি মারা যাচ্ছি। কিন্তু হাল ছাড়েননি আমার মা। মায়ের সেবাযতেœ শেষ পর্যন্ত আমি বেঁচে গেছি। আনন্দ-বেদনা ও সংগ্রাম-সবকিছু মিলেই কেটেছে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সময়। ১৯৮৩ সালে আমি আমেরিকায় একটা সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েছিলাম। আমি নিজেই ড্রাইভ করছিলাম। অন্য একটা গাড়ির সঙ্গে আমার গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ওই সময় আমার বেঁচে থাকার কথা নয়। আমার পাঁজরের অনেকগুলো হাড় ভেঙে যায়। আমাকে হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন আমি আমেরিকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছিলাম। কিন্তু মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছি। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সময়ও আমার ধারণা হয়েছিল, আমি উত্তরণ ঘটাতে পারব। এটা একটা মনোবলের লড়াই ছিল। আমার দৃঢ় মনোবলে করোনা জয় করি। করোনা যুদ্ধে আমি আত্মসমর্পণ করতে চাইনি। আমি এক সময় ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে আমার একটা ভূমিকা ছিল। ওই সময় আমি মনে করি, আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে। এ কারণেই আমি বহু বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যাপনার পর ১৯৯১ সালে দেশে ফিরে আসি। দেশে ফিরে এসে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমি নিজেকে সমর্পণ করব। সেই লক্ষ্যে অনেকগুলো কাজ শুরু করেছি আমি। প্রথম থেকেই বহু স্বেচ্ছাসেবীকে প্রশিক্ষিত করেছি। বহু তরুণসহ সমাজের সব স্তরের মানুষকে প্রশিক্ষণ দিই। তাদের নিজের জীবন ও এলাকার পরিবর্তন আনতে কাজ করছি। এক পর্যায়ে ২০০২ সালে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃতে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) প্রতিষ্ঠা করি। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে সুসংহত করতে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করি। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সময় আমি মনে করি, এই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অব্যাহত রাখতে আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। প্রায় মাসখানেক করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সময় আমি জীবনের ভালো কাজগুলো পর্যালোচনা করেছি। এটা আমাকে শক্তি দিয়েছে। জুন মাসের শেষ সপ্তাহটা আমার জন্য খুবই কষ্টের ছিল। এই সময়টা আমি সারা রাত জেগে ছিলাম। শরীর এতটাই দুর্বল ছিল যে, জ্বর যখন আসত তখন আমার হুঁশ থাকত না। চরমভাবে আমি দুর্বল ছিলাম। কোনো কিছুই খেতে পারতাম না। কাশি ছিল। এটা একটা দুর্বিষহ সময় ছিল। আমি যখন জাগ্রত ছিলাম সব সময় ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করেছি। মনে মনে বলেছি, এই সংকট কেটে যাবে। এই ব্যাধির ইতিবাচক দিক হলো, মৃত্যুর হার কম। আমি মৃত্যুর মিছিলে যোগ দেব না। এ সময় আমি আমার জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো, যা আমাকে পুলকিত করেছে, আনন্দ দিত তা নিয়ে ভেবেছি। সব সময় বলেছি, আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। এই কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমি অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও বেঁচে আছি। এ সময় আমার আমেরিকায় জন্ম নেওয়া ছেলের সন্তানের ছবি দেখতাম। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে নিজেকে আনন্দে রাখার চেষ্টা করতাম। সেই সময়ও যতক্ষণ জাগ্রত ছিলাম, ততক্ষণ আমি নিজেকে শক্তি জোগাতে চেষ্টা করি। কিছু কাজকর্ম করার চেষ্টা করি। এ সময় আমি প্রায় প্রতিদিনই আমার সহকর্মীদের সঙ্গে ফোনে আলাপ করি। আমি কাউকে জানতে বা বুঝতে দিইনি, আমি যে এতটা দুর্বল। সবার সঙ্গে আমি স্বাভাবিকভাবেই কথাবার্তা বলেছি। কিন্তু আমার সহকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের নানা কার্যক্রমই আমাকে সাহস জুগিয়েছে, অনুপ্রেরণা দিয়েছে। আমি মনে করি, করোনা একটি মনোবলের লড়াই। এই লড়াইয়ে আমি জিতে এসেছি। এ সময় আমি শুধু আমার নিজের অভিজ্ঞতাই নয়, দুঃসাহসিক ব্যক্তিদের কাহিনি পড়েছি। কিছু মুভিও দেখেছি। একটি বিখ্যাত মুুভির কথাও মনে পড়ে। মুভির নাম ‘আইরন উইল’। সেখানে দেখেছি, কীভাবে প্রাকৃতিকসহ নানা প্রতিকূলতা বা বাধা কেটে ওঠা যায়। সেই মুভিতে দেখা যায়- যেটা তার জেতার কথা নয়, সেখানেও নানা বাধা পেরিয়ে জিতেছেন। সেখান থেকেও আমাকে শক্তি, সাহস জুগিয়েছে। আমিও মনে করেছি, আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। আমার অসম্পূর্ণ কাজগুলো অব্যাহত রাখতে হবে। আমিসহ আমার পরিবারের সবাই এখন করোনামুক্ত। এখন আমি মনে করি, আমার করোনা জয়ের পেছনে পরিবারের সেবা-শুশ্রƒষা ও বহু শুভাকাক্সক্ষীর শুভকামনা ও ভালোবাসা ছিল। আমাদের পরিবারের সবাই আক্রান্ত হওয়ায় খাবার বা ওষুধপত্র সেবনে কোনো সমস্যা হতো না। সবাই একত্রেই থাকতাম। পরিবারের সদস্যরাই আমাকে খাবার ও ওষুধ সেবন করাত। আমার বাসার গৃহকর্মী ও দারোয়ানও ছুটিতে ছিল। সব আমরা নিজেরাই করতাম। সবকিছুই আমরা সাবধানতার সঙ্গে করেছি। কাউকেই আমাদের বাড়িতে আসতে উৎসাহিত করিনি। আমরাও কোথাও যাইনি। করোনার এই সময়ে আমরা কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা সহকর্মীদের নিয়ে সারা দেশে ১৫০০ গ্রামে প্রতিটি মানুষকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, করোনাসহিষ্ণু গ্রাম করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি। প্রত্যেকেই নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। নইলে একজনের মাধ্যমে গ্রামের সবাই সংক্রমিত হতে পারে। যেহেতু করোনাভাইরাস সহজেই দূরীভূত হবে না, এখনো কার্যকর কোনো ওষুধ পাওয়া যায়নি-তাই নিজেকেই নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। করোনার সঙ্গেই আমাদের সহাবস্থান করতে হবে। আমাদের করোনাসহিষ্ণু হতে হবে। এ লক্ষ্যেই ১৫০০ গ্রামে আমরা কাজ শুরু করেছি। এরই মধ্যে আমরা ইতিবাচক ফলাফলও পাচ্ছি। আমি মনে করি, অন্যরাও যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তারাও তাদের গ্রামে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমরা যে উদ্যোগটা নিয়েছি, তা প্রতিটা গ্রাম বা মহল্লায় সবাইকে নিয়ে করতে পারলে সংক্রমণ কমে আসবে। এক পর্যায়ে থাকবেই না। সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থা মিলে কাজ করতে পারলে করোনার থাবা থেকে জাতিকে মুক্ত করতে পারব বলে আমি বিশ্বাস করি।

    ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক-সুশাসনের জন্য নাগরিক।

    বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে


    error: Content is protected !! please contact me 01718066090