আজ

  • মঙ্গলবার
  • ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ১১ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ফেনীর হিমুর মুখে বনানীর আগুন ‘মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে ফিরবো ভাবিনি’

  • আরিফ আজম
  • ‘পুরো অফিস ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়, কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ঘটনার ভয়াবহতায় চিৎকার- চেঁচামেচি আর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সহকর্মীরা। কেউ কোনদিকে বের হওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মুখে শার্ট বেঁধে ছাঁদে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। করিডোর থেকে আবার অফিস কক্ষে ঢুকে পড়ি। বিদঘুটে অন্ধকার। ভীতিকর পরিবেশ। সবাই পরিবার-পরিজনের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলা আর এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছিলেন। আমিও আব্বু-আম্মু, ছোট বোন, জেঠিমাকে ফোনে চেষ্টা করছিলাম। কারো সাথে সংযোগ পাইনি। এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির কথা মনে পড়লে ভাবতেই পারছিনা- এখনো বেঁচে আছি। কারণ বেঁচে ফিরবো কখনোই ভাবিনি। বিভৎস্য এ ঘটনায় সহকর্মীদের ১০ জনই মারা গেছেন।’

    রাজধানীর বনানীর এফ.আর টাওয়ারের অগ্নিকান্ডে বিভীষিকাময় মুহুর্তের কথাগুলো মঙ্গলবার এই প্রতিবেদককে বলছিলেন মোরশেদ জাহান হিমু। সে ফেনী শহরের বিরিঞ্চি এলাকার কদলগাজী রোডের বাসিন্দা রেলওয়ে কর্মরত শাহজাহান বাবুলের একমাত্র ছেলে। তার এক বোন ফেনী সরকারি কলেজে অনার্স অধ্যয়নরত। ২০১০ সালে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এসএসসি, ২০১২ সালে ফেনী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ অধ্যয়নরত হিমু পড়াশোনার পাশাপাশি হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস লিমিটেডে চাকুরি করছেন। ২২ তলা ভবনটির ১০তলায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়।

    ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে হিমু জানায়, ‘গত ৬ মাস আগে হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস লিমিটেডে চাকুরি নিই। ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার সাড়ে ১২টার দিকে ৮ম তলায় আগুন লাগে। আমাদের প্রতিষ্ঠানের এমডি ফয়েজুল ইসলাম স্যার ফোনে বললেন ছাদে যেতে। কিন্তু আমরা কেউ যেতে পারিনি। তখন সবাই পরিবারের সাথে ফোনে ব্যস্ত। সহকর্মী আবু হেনা ইফতি ফোনে স্বজনদের বলছিলেন বেঁচে ফিরলে দেখা হবে। তার এ কথায় আরো ঘাবড়ে যাই। নিচেও নামতে পারছিনা, উপরেও উঠতে পারছি না। কনফারেন্স রুমে গিয়ে দেখলাম একটি গ্লাস আছে। ঝুঁকি জেনেও ওই গ্লাসটি ভেঙ্গে ভবনের বাইরে এসির জন্য তৈরি লোহার উপরে উঠে বসার চেষ্টা করলাম। প্রথমবার সাহস না পেয়ে ভয়ে অফিসের ভেতরে ঢুকে পড়ি। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করি। পরে ভাবলাম- লাফ দিবো, যা হওয়ার হবে। এসময় দেখি বাইরে বিদ্যুত, ডিস, ওয়াফাই সহ আরো কিছু কেবলের তার।

    পা দিয়ে টেনে ধরে সেগুলোতে ঝুলে পড়লাম। ২০ মিনিট ধরে ঝুলতে থাকলাম। মনে সাহস নিয়ে আস্তে আস্তে নামতে থাকলাম। ৫ম কিংবা ৪র্থ তলা পর্যন্ত নেমে আটকে যাই। ততক্ষনে শরিরের সবশক্তি হারিয়ে ফেলি। ৩য় তলা পর্যন্ত নামার পর নিচে উৎসুক লোকজন সাহস দিচ্ছিলেন। ভারী একটা কিছু ডান হাতে পড়ে আঘাত পাই। যখন নামছিলাম তখন একটিবারের জন্যও নিচের দিকে তাকাইনি। উপরের দিকে তাকিয়ে ভাবি হয়তো আর অল্প একটু। শরিরে শক্তি না থাকলেও মনোবল নিয়ে নামতে থাকি। ১০ ফুট পর্যন্ত পৌঁছে তখন একজনের কাঁধে পা রেখে ভর করে নেমে ফুটপাতে বসি। তখনো ফায়ার সার্ভিস, এ্যাম্বুলেন্স কিংবা কোন সাহায্যকারি সংস্থা এসে পৌঁছেনি। পরে ফুটপাত থেকে তাকিয়ে দেখি আমাকে অনুসরণ করে অফিসের পিয়ন বেলাল ও এক সহকর্মী নেমে আসেন। আরো দুইজন মামুন ভাই ১০ তলা থেকে পড়ে মারা যান। মুনির ভাই দুইজনের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে মারা যান।

    জেমি ভাই, রুমকি আপা দু’জনই স্বামী-স্ত্রী। চাকুরি করতেন আমাদের একই অফিসে। রুমকি আপা দম বন্ধ হয়ে মারা যান। জেমি ভাই লাফ দিয়ে মারা যান। খবর পাই আমার অফিসের ১০ জন সহকর্মীই বেঁচে নেই।
    হিমু আরো জানায়, আমি নামার সময় অন্য সহকর্মীদের নামতে সাহস যোগাই। কিন্তু কেউ সাহস করেননি। সাহস হারিয়ে তারা জীবনের আশা ছেড়ে দেন। অনেকে দম বন্ধ হয়ে মারা যান। পরবর্তীতে আগুনে তাদের মৃতদেহ পুড়ে যায়। জেবিন আপুকে (জেবুন্নেসা) বেশি মিস করছি। তার কোন ভাই নেই। তিনি আমাকে ভাই বলে ডাকতেন। উনি শ্বাস কষ্টে মারা গেছেন। তাকে আমি বাঁচাতে পারিনি। তানজিলা আপুর শরিরের ৯৮ শতাংশ পুড়ে যায়।

    আবেগাপ্লুত হয়ে হিমু জানায়, এ দু:সহ স্মৃতি আমায় কখনো ভালো হতে দেবে না। জানিনা আমি কবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবো। এ স্মৃতি প্রত্যেকটা সময় আমায় ভাবায় এবং কাঁদায়। চেনা মানুষগুলো আমার চোখের সামনে এভাবে মৃত্যুর মুখে পড়ে গেলো। আমরা সবাই বেঁচে ফিরতে পারতাম যদি একটা ফায়ার এলার্মিং থাকতো বা বেরিয়ে আসার সুযোগ থাকতো। মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখেও এক দুনিয়ায় আমি দ্বিতীয় বার জীবন পেয়েছি। মা-বাবা আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। এজন্য মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে বেঁচে ফিরেছি। এজন্য তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

    সম্পাদনা : এএএম/এটি


    error: Content is protected !! please contact me 01718066090